Read this blog post in English →
Read this blog post in Hindi →
লেখক: শুভাশিস পাণিগ্রাহী, মারি মৈত্রেয়ী, ক্লাউডিয়া পোজো
Translated by: Dipanjan Das

ইন্টারনেট আমাদের ব্যাপক আকারে সংযুক্ত করেছে, জ্ঞান বা তথ্য, এবং এমনকি জরুরি পরিষেবাও ভাগ করে নিতে সাহায্য করেছে। তবুও, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জনসংখ্যার প্রায় ১৫% তাদের প্রতিবন্ধকতার কারণে বাদ পড়েছে। যে-সমস্ত দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তি ইংরেজি বা অন্য অ-ইউরো-ঔপনিবেশিক ভাষায় কথা বলে না, তারা আরওই বাদ পড়ে যায়, কারণ–ফরম্যাটের অ-অ্যাকসেসযোগ্যতা, খারাপ আঞ্চলিকীকরণ এবং ব্যয়বহুল, বদ্ধ প্রযুক্তি। এইখানেই আসে অ্যাকসেসিবিলিটি, ল্যাঙ্গুয়েজ, অ্যান্ড টেক ফর দ্য পিপ্ল (যার অর্থ: অ্যাকসেসযোগ্যতা, ভাষা ও সকলের জন্য প্রযুক্তি, বা এএলটি)—নামের প্রায়োগিক গবেষণা-উদ্যোগটি। এর মর্মমূলে আছে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের সংযুক্তি আরও বাড়ানো, এবং তাদের অনলাইন অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করার সংকল্প। ব্যবহারকারী হিসেবে এবং ডিজিটাল জ্ঞানের উৎপাদনকারী হিসেবে—দুটি ভূমিকাতেই। এএলটি—‘ভাষাগত ন্যায়বিচার’ ও প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকারের প্রতিচ্ছেদকে মান্যতা দেয়, এবং এ-দুয়ের মধ্যেকার দূরত্বকে জুড়তে চায়। এই উদ্যোগের ক্রিয়া-কেন্দ্র হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৬৫০ রকমের ভাষা এবং ২০৪-৩০৬ মিলিয়ন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তির বাস। আমাদের চলমান উদ্যোগটির কেন্দ্রে রয়েছে ভারতে হিন্দি ও বাংলা, বাংলাদেশে বাংলা এবং পাকিস্তানে উর্দু ভাষা ব্যবহারকারী দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিরা।
এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৭৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ ‘মেজরিটি ওয়ার্ল্ড’-এর, সেখানে তাদের স্থানীয় ভাষায় ইন্টারনেট ব্যবহার ও পরিচালনা করা এখনও একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রতিকূলতা আরও বেড়ে যায়, কারণ তারা ইতোমধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেই নানারকম বাধার সম্মুখীন। এই প্রায়োগিক গবেষণা-উদ্যোগটি যৌথভাবে সহ-নির্মাণ, সহ-নেতৃত্ব ও সহ-নির্মাণকৃতিত্বের উপর জোর দেয়, যাতে এটা নিশ্চিত করা যায় যে, প্রকল্পটি যাদের হিতার্থে, তাদের প্রয়োজন ও তাদের কণ্ঠ/উপস্থিতি এতে থাকে।
বর্তমান ব্লগটি এএলটি প্রায়োগিক গবেষণা-উদ্যোগের সদস্যদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ভাগ করে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। এখানে, নিজেদের পছন্দের ভাষায় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে তাদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ কী কী উঠে আসছে, তা খুঁজে বের করা, এবং সেগুলি উন্নত করার কী কী সুযোগ আছে—তা চিহ্নিতকরণের চেষ্টা হয়েছে।
ডিজিটাল অ্যাকসেসযোগ্যতার মূল বাধাগুলির অনুসন্ধান
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা হল, অ্যাকসেসযোগ্যতার ও ব্যবহারযোগ্যতার মধ্যেকার পার্থক্য। হতে পারে কোনও প্রযুক্তি খাতায়-কলমে অ্যাকসেসযোগ্য, কিন্তু তা বাস্তবে ব্যবহারকারী-বান্ধব নয়। দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিলতা আরও বাড়িয়ে দেয়। ভারতের আইআইটি হায়দ্রাবাদের ওপেন নলেজ ইনিশিয়েটিভ প্রোগ্রামের বরিষ্ঠ গবেষণা-পরিচালক স্নেহা যেমনটা জানাচ্ছেন: “ডিজিটাল ডিভাইসের অ্যাকসেসযোগ্যতার বিষয়টিকে এর নিজস্ব একটি সমস্যা হিসেবেই বিচার করতে হবে। কেবল অ্যাকসেসযোগ্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এটি অত্যন্ত ব্যবহারকারী-বান্ধব, সহজলভ্য অথবা ব্যবহার করতে প্রশিক্ষণ এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার দরকার নেই। বরং, যেসব প্রযুক্তি ব্যবহার-উপযোগী কিন্তু অ্যাকসেসযোগ্য নয়, সেগুলি প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আরও জটিলতার সৃষ্টি করে।” এই একই মনোভাব প্রতিধ্বনিত হয়েছে অরবিন্দ শর্মার বক্তব্যেও। তিনি সক্ষম-অ্যাসিস্টেক ল্যাব (আইআইটি দিল্লি)-এর মুখ্য প্রশিক্ষক, এটি একটি যৌথ উদ্যোগ, যেখানে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের সহায়ক-প্রযুক্তির সাহায্যে পড়া, লেখা ও ডিজিটাল সাক্ষরতার পাঠ দেওয়া হয়। তিনি নির্দেশ করছেন: “এখানে বিষয়বস্তু অ্যাকসেসযোগ্য হলেও সে-সম্পর্কে আসলে মানুষের কাছে খবর পৌঁছয় না।”
স্থানীয় বিষয়গুলির ভাষা ও গুণমান আরও একটি গুরুতর বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক প্রযুক্তিগত সমাধান এবং প্ল্যাটফর্ম আছে, যেগুলিতে ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনও ভাষার ক্ষেত্রে সহায়তার অভাব রয়েছে। যার ফলে, অ-ইংরেজিভাষীদের পক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রোডস স্কলার এবং পাকিস্তানে অ্যাকসেসযোগ্যতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রবক্তা খানসা মারিয়া জানাচ্ছেন: “আমাদের কাছে অন্য ভাষাগুলির মতো বিভিন্ন রকমের প্রযুক্তিগত সমাধান নেই। কাজেই, আমার প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রাথমিক ভাষা ইংরেজিই।” অধিকন্তু, স্থানীয় ডিজিটাল উপাদানগুলি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে, এবং যন্ত্র-অনুবাদকগুলি প্রায়শই অকার্যকরী হয়। যেমনটা ঈশান, ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক, এবং ভাষা ও অ্যাকসেসযোগ্যতা কর্মী জানাচ্ছেন: “সহজলভ্য যান্ত্রিক অনুবাদকগুলি ত্রুটিপূর্ণ অনুবাদ করে, কারণ এগুলি তৈরিই হয়েছে ত্রুটিপূর্ণভাবে।” ভাস্কর, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক পরামর্শদাতা, তিনি বাংলাদেশে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের উন্নয়ন, ই-অ্যাকসেসযোগ্যতা এবং তথ্যের অ্যাকসেসযোগ্যতা নিয়ে কাজ করছেন। তিনিও জানাচ্ছেন, বাংলায় চ্যালেঞ্জ হল ইউনিকোড পূর্ববর্তী লেগ্যাসি (অপ্রমিত) ফন্টের প্রচলন। এর ফলে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে সেগুলি দুষ্পাঠ্য হয়ে ওঠে: “অ্যাকসেসযোগ্য বিষয়বস্তুর অভাব বাংলার ক্ষেত্রে বড়মাপের চ্যালেঞ্জগুলির একটি। তার উপর রয়েছে ভালো মানের কি-বোর্ডের অভাব ও তার ফলে ভাষা-ইনপুটের ক্ষেত্রে জটিলতা। এখনও অনেকেই ইউনিকোড মানের পূর্ববর্তী, পুরনো, অপ্রমিত ফন্ট ব্যবহার করেন, যেগুলি স্ক্রিন রিডারগুলি পড়তে পারে না। দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে এইজাতীয় বিষয়বস্তু অ্যাকসেসযোগ্য নয়।”
রাহুল বাজাজ, একজন আইনজীবী এবং মিশন অ্যাকসেসিবিলিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা—ভারতে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যবহারকারীদের কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় সে সম্পর্কে আরও বিস্তারিতভাবে জানাচ্ছেন। তিনি স্ক্রিন রিডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন— হিন্দি ভাষার বিষয়বস্তুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্ক্রিন রিডারগুলিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।তিনি জানাচ্ছেন: “আমি ব্যক্তিগতভাবে যে মূল বাধার মুখোমুখি হই, এবং আমি জানি যে এটা একটা চ্যালেঞ্জ, সেটা হল স্ক্রিন রিডারের পক্ষে সহজে হিন্দি ভাষার বিষয়বস্তুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।” এই সমস্যার সঙ্গে যোগ হয় অ্যাকসেস করার এবং মসৃণভাবে ডিভাইসগুলিতে হিন্দি ভাষার কণ্ঠগুলির মধ্যে ভাষা পরিবর্তন করার অসুবিধা। যার ফলে হিন্দি ভাষার বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সামর্থ্য খর্ব হয়।
প্রযুক্তিগত বিন্যাস, এবং ডিজিটাল বিষয়বস্তুর ধরন—প্রায়শই অ্যাকসেসযোগ্যতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অ-অ্যাকসেসযোগ্য পিডিএফ, অপ্রমিত-লেগাসি ফন্ট এবং অল্ট টেক্সট ছাড়া ছবিজাতীয় উপাদান—স্ক্রিন রিডারের কার্যকারিতায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এবং ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে কার্যকরীভাবে তথ্য বুঝতে পারা ও পরিচালনা করতে পারার যে সামর্থ্য—তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে। অরবিন্দ দেখাচ্ছেন: “যখন কোনও পিডিএফ অ্যাকসেসযোগ্যভাবে তৈরি হয় না, তখন আমাদের স্ক্রিন রিডার সফ্টওয়্যার তা পড়তে পারে না।” একইরকমভাবে, শ্রীনিধি, ভারতের একজন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত নারীবাদী, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও লেখক বোঝাচ্ছেন যে, স্ক্রিন রিডার ব্যবহারকারীরা চোখ বুলিয়ে যেতে পারে না, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে পংক্তি ধরে ধরে চলতে হয়, যার প্রভাব পড়ে তথ্য প্রক্রিয়াকরণে।
নির্মিতা, যিনি ডিজিটাল অ্যাকসেসযোগ্যতা এবং প্রতিবন্ধকতা-বিষয়ক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিসরে নীতি ও গবেষণার কাজ করেন, তিনিও ছাত্রাবস্থায় তামিল ভাষায় বিষয়বস্তু অ্যাকসেস করতে গিয়ে কীভাবে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সঙ্গীত বিষয়ে লেখাপড়া করতে গিয়ে তিনি তামিল ও সংস্কৃতের মতো ভারতীয় ভাষাগুলিতে গান, পাণ্ডুলিপি ও স্বরলিপি অ্যাকসেস করতে পারেননি, এবং কেবলমাত্র ইংরেজি বইতে লভ্য জ্ঞানের উপরেই তাঁকে নির্ভর করতে হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, অনুবাদের ব্যবস্থা ও অন্যান্য অ্যাপস থাকা সত্ত্বেও যেহেতু অনুবাদগুলি ত্রুটিপূর্ণ, ফন্টগুলি পঠনযোগ্য নয়, এবং সহায়তাও তেমন নেই, তাই হিন্দি বা অন্য ভারতীয় ভাষাগুলিতে বিষয়গুলি সমানভাবে সহজলভ্য নয়। বিভিন্ন ভাষায় ই-স্পিক—এর মতো যান্ত্রিক ধ্বনির কণ্ঠস্বর ভালোভাবে বুঝতে পারাও অনেকের পক্ষে চ্যালেঞ্জিং, যেহেতু এর উচ্চারণ স্বাভাবিক নয়, এবং এতে ইংরেজির একটা বাচনভঙ্গি থাকে। যারা একেবারেই ইংরেজি জানে না, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি তাদের খুবই নিরুৎসাহিত করে। তিনি নিরন্তর সহায়তা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন, যাতে এটা নিশ্চিত করা যায় যে মানুষজন কার্যকরীভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটাল পরিসরে গতায়াত করতে পারে। এভাবেই তিনি দৈনন্দিন জীবনে অ্যাকসেসযোগ্য সমাধান দেখিয়েছেন। “ অ্যাকসেসযোগ্য সমাধানের কথা বলতে গিয়ে বলতে হয়, আমি আমার স্মার্টফোন এবং ল্যাপটপ সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি। যে সমস্ত দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিরা তাদের স্থানীয় ভাষায় ইন্টারনেট, ডিজিটাল বিষয়বস্তু ও পরিষেবা অ্যাকসেস করতে চায়, তাদের ক্ষেত্রে বেশ জোরালো একটি সমাধান হতে পারে এনভিডিএ ভাষা প্যাকগুলি কম্পিউটার বা ফোনে ইন্সটল করা।”
সহায়ক প্রযুক্তিগুলির খরচ, তার সঙ্গে সাধারণভাবে অ্যাকসেস, দক্ষতা ও লভ্য সমাধানগুলি সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব যুক্ত হয়ে একটি গুরুতর বাধার সৃষ্টি হয়। খানসা আর্থিক দিকটি উল্লেখ করছেন: “সহায়ক প্রযুক্তিগুলি ব্যয়বহুল হওয়ার বিষয়টি আমার তীব্র অপছন্দ।” ভাস্কর এর সঙ্গে যোগ করেন যে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের প্রায়শই প্রযুক্তিগত দক্ষতা কম থাকে এবং লভ্য পরিষেবাগুলির ব্যাপারে তথ্যও তাদের কাছে অপর্যাপ্ত থাকে। ঈশানও ইন্টারনেট এবং ডিভাইসগুলিকে অ্যাকসেসযোগ্য করে তোলার বিষয়টি তুলে ধরেন, যাতে এখনও যারা এই প্রযুক্তিগুলির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, তারাও এর সুবিধা পেতে পারে। আসলে প্রযুক্তির অ্যাকসেসযোগ্যতা প্রায়শই বিশেষ সামাজিক সুবিধার সঙ্গে জড়িত। ঈশানের পর্যবেক্ষণ, উপমহাদেশের বহু দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তি, যারা প্রান্তিক শ্রেণি, বর্ণ ও অন্যান্য সামাজিক অবস্থানের, তারা সম্পূর্ণরূপে প্রযুক্তির সুবিধার বাইরে থেকে যায়।
অ্যাকসেসযোগ্য প্রযুক্তির সম্ভাবনা
সাক্ষাৎকারদাতাদের ভাবনা অনুযায়ী, আমাদের সামনে এখন উপায় প্রযুক্তি ও লোকবল কাজে লাগিয়ে প্রকৃত অ্যাকসেস ও স্বাধীনতার পথ নির্মাণ করা। সহায়ক প্রযুক্তি—ক্ষমতায়নও হয়ে উঠতে পারে, যেমনটা অরবিন্দ চিহ্নিত করেছেন: “আমাদের স্ক্রিন রিডার আমাদেরকে সবই বলে দেয়।” তিনি এর সঙ্গে যোগ করছেন “ আমি এটা খুবই পছন্দ করি, এটা ভীষণ শক্তিশালী। এটা এমন একটা আবিষ্কার, যা আমাদের জীবনকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছে। আপনি স্ক্রিন রিডার দিয়ে হিন্দি ভাষার বিষয়গুলি অ্যাকসেস করতে পারেন।” স্নেহা বাস্তবিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং ডিজিটাল অ্যাকসেসযোগ্যতার মধ্যে সাদৃশ্য স্থাপন করার পরামর্শ দিচ্ছেন। যেমন— ছবির বর্ণনা (অল্ট টেক্সট) যুক্ত করা, রংয়ের বৈপরীত্য নিশ্চিত করা এবং অ্যাকসেসযোগ্য ভাষা ব্যবহার করা, যাতে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে ইন্টারনেট আরও ব্যবহারোপযোগী হয়ে ওঠে। খানসা—স্বাধীনতা ও অ্যাকসেস বাড়ানোর গুরুত্বের উপর জোর দিচ্ছেন। তাঁর অবস্থানে আরও আছে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার জন্য গোষ্ঠীগত পরিসর তৈরি করা, প্রচার এবং সংহতি। তিনি উল্লেখ করছেন: “অজস্র জ্ঞান আছে এবং তার চেয়েও বেশি লোকজন আছে, যারা সাহায্য করতে চায়। একটি পরিসর তৈরি করলে এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে থেকেও জ্ঞান উঠে আসতে পারে ও সমস্যার সমাধানে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে, তার ফলে আমরা একত্রে প্রচারকাজ, গোষ্ঠী নির্মাণ এবং সম্পদ ও পরিসর ভাগ করে নেওয়ার কাজ করতে পারি। যখন প্রযুক্তি আমাদের হতাশ করে, তখন আমাদের একজোট হয়ে তদবির করা উচিত।”
ভাস্কর—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কথা-থেকে-লেখা—এর ব্যবহারিক উপকারিতার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করছেন। তিনি বোঝাচ্ছেন: “কথা-থেকে-লেখা—এর সাহায্যে আমি সহজেই কথা বলার মাধ্যমে লিখে নিতে পারি। এটা আমার জন্য একটা মস্ত সমাধান। একটি অ্যাকসেসযোগ্য সমাধান মানুষজনের জীবন বদলে দিতে পারে।” পাশাপাশি, তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন বস্তু ও মানুষকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার প্রতি। এর ফলে দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে অনেকটা সুবিধা হবে এবং একটি সম্পূর্ণ অ্যাকসেসযোগ্য প্ল্যাটফর্মের স্বপ্নের পথে অগ্রসর হওয়া যাবে।
শ্রীনিধি, যদিও দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তি নন, কিন্তু তিনি ওসিআর এবং এআই নির্ভর ছবির বর্ণনায় যে অগ্রগতি হয়েছে, তা স্বীকার করছেন। তিনি উল্লেখ করেন: “এমনকি তিন বছর আগেও ওসিআর যেমন ছিল, তার তুলনায় এখন বিপুল উন্নত হয়েছে। এখন চ্যাটজিপিটি ফেসবুকের চেয়ে অনেক ভালো ছবির বর্ণনা লিখতে পারে।” যাহোক, তিনি প্রযুক্তি নির্মাণকারী গোষ্ঠীগুলির কাছে প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে আরও সূক্ষ্ম ধারণা গড়ে তোলার ডাক দিচ্ছেন। বলছেন, “খুব হাতেগোনা কয়েকজন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যারা প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতার সূক্ষ্মতা সম্পর্কে অবহিত। এআই নানারকমভাবে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের জীবনকে উন্নত করেছে, বিশেষ করে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের জীবনকে।”
ঈশান সহজলভ্য অডিয়ো-বইয়ের প্রাচুর্যের উপর জোর দিয়ে ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকা তুলে ধরছেন, জানাচ্ছেন, “ইউটিউব তাদের ব্যবহারকারীদের অডিওবুক সহ নানাবিধ দৃশ্য-শ্রাব্য বিষয়বস্তু তৈরীর অনুমোদন দিয়ে একটি বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে।” একইসঙ্গে তিনি বাংলা ভাষায় প্রতিবন্ধকতা বিষয়ক প্রচারে সমাজমাধ্যমের বর্তমান ব্যবহারকে তুলে ধরেছেন, এবং ভিডিয়ো কনটেন্টে শিরোনাম যোগ করা বা শ্রুতি-বর্ণনা যোগ করা—জাতীয় ব্যাবহারিক উন্নতিবিধানের দাবি জানিয়েছেন।
নির্মিতাও জোর দিয়েছেন প্রযুক্তির ক্ষমতায়ন ঘটানোর সম্ভাবনাটির উপর। এনভিডিএ যুক্ত স্মার্টফোন এবং ল্যাপটপকে বর্ণনা করা হয়েছে “শক্তিশালী সমাধান” হিসেবে, যা স্বাধীনতা ও উদ্বর্তনকে সক্ষম করে। এগুলি দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের— তথ্য অ্যাকসেস করা, কাজ করা এবং বিনোদনের সুযোগ দেয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন রিমাইন্ডারের জন্য অ্যালেক্সা ব্যবহারের কথা। যা দৈনন্দিন কাজকর্মে কণ্ঠস্বর-চালিত প্রযুক্তির সম্ভাবনাময় দিকটি তুলে ধরে। সীমাবদ্ধতাগুলি, বিশেষ করে কিছু সমাধানের ইংরেজি-কেন্দ্রিক হওয়ার প্রবণতা স্বীকার করেও, নির্মিতার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, প্রযুক্তি—জীবনের নানাক্ষেত্রে দূরত্ব কমাতে ও অংশগ্রহণ সহজ করতে সহায়ক হতে পারে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, মসৃণভাবে ডিজিটাল সংযুক্তির জন্য হিন্দিতে কথা-থেকে-লেখা—প্রযুক্তিকে শক্তিশালী করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। যেমনটা রাহুল জোর দিয়ে বলছেন: “আমাদের ভালো হিন্দি কথা-থেকে-লেখা—প্রযুক্তি চাই, ফোন এবং কম্পিউটার—দু-জায়গাতেই। যেন সেগুলো সহজেই ইন্সটল করা যায়, আর যেমন যেমন বিষয়বস্তু সামনে আসবে, সেই অনুযায়ী কোনওরকম গোলমাল ছাড়াই সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইংরেজি থেকে হিন্দিতে পরিবর্তন ঘটাতে পারে।” এইজাতীয় অগ্রগতি—বাধাবিঘ্নের পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমাবে এবং হিন্দিভাষী দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অনলাইন অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করবে।
ভবিষ্যতের পথ
এইসব অভিজ্ঞতা থেকে এটা স্পষ্ট যে ইন্টারনেটের অগাধ সম্ভাবনা সত্ত্বেও, ডিজিটাল অ্যাকসেসযোগ্যতার সহায়তায় স্বাধীনতা ও মর্যাদালাভের পথে বাধাবিঘ্নগুলির অপসারণ এখনও অনেক বাকি। যখন দক্ষিণ এশিয়ায় ৬১.২ মিলিয়ন দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তি এইসব বাধাবিঘ্নের মুখোমুখি হচ্ছে, তখন যারা ইংরেজি ও ইউরো-ঔপনিবেশিক ভাষাগুলি ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলে, তারা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। বাধাবিঘ্নগুলি—যেমনটা আগেই আলোচনা করা হয়েছে—ইউনিকোড অনুবর্তিতা থেকে শুরু করে জটিল দক্ষিণ-এশীয় লিপির ক্ষেত্রে পিডিএফ-অ্যাকসেসযোগ্যতা, লিখিত বিবরণ, প্রাথমিক ব্যবহারযোগ্যতা, ভাষা-সহায়তা, প্রযুক্তিগত বিন্যাস, সহায়ক প্রযুক্তির খরচ এবং প্রশিক্ষণ ও দলবদ্ধভাবে সহ-নির্মাণ অবধি সবই অপ্রতুল। সবটা মিলে একটা জটিল চ্যালেঞ্জের জাল তৈরি করে; অবিলম্বে এর প্রতিকার প্রয়োজন। এই বাধা ভাঙার প্রথম ধাপ হল এগুলিকে চিহ্নিত করা ও বুঝতে পারা। সাক্ষাৎকারদাতাদের ভাবনা অনুযায়ী, একমাত্র এই বাধাগুলি সরাতে পারলেই ডিজিটাল বিশ্ব—ভাষা, সক্ষমতা বা আর্থ-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সকলের জন্য, প্রকৃত অর্থে একটি সমতাভিত্তিক পরিসর হয়ে উঠতে পারে।
সাক্ষাৎকারদাতাদের অগ্রণী ভূমিকা ও তাঁদের উপলব্ধি—অ্যাকসেসযোগ্য প্রযুক্তি থেকে শুরু করে স্ক্রিন রিডার, কথা-থেকে-লেখা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত যন্ত্রপাতি ও ইউটিউবের মতো অনলাইন কনটেন্ট ভাগ করে নেওয়ার প্ল্যাটফর্ম—এইজাতীয় নানা ক্ষেত্রে প্রগতির পথনির্দেশ দেয় আমাদের। গুরুত্ব নির্বিশেষে এই অ্যাকসেসযোগ্যতা বিষয়ে প্রতিটি সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীদারদের বিপুল সংখ্যায় কাজে লেগে পড়তে হবে। অতএব, প্রতিকারের দাবি জানাতে একটি গোষ্ঠীভিত্তিক সম্মিলিত প্রচার প্রয়োজন। তৃণমূল স্তরে সংগঠিত প্রচারের পরিপূরক হিসেবে বাংলা, হিন্দি ও উর্দু ভাষা ব্যবহারকারী দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের যে গুরুতর সমস্যাগুলির মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলি নথিবদ্ধ করা এএলটির উদ্দেশ্য।
আমরা মনে করি এই কাজটি কেবলমাত্র প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি ক্ষমতার বণ্টন, জ্ঞান ও ন্যায়বিচারের বিষয়। এবং এটা নিশ্চিত করা, যাতে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিরা ডিজিটাল বিশ্বে পরিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। আমাদের সহযোগীরা ইতিমধ্যে ক্ষমতা-কাঠামোগুলিকে চ্যালেঞ্জ করছে, এবং আমরা আশা করি অ্যাকসেসযোগ্যতা দাবী করার জন্য সাক্ষ্যভিত্তিক সংস্থান তাদের হাতে আরও উঠে আসবে। এএলটি প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রতিকতম তথ্য পেতে আমাদের সঙ্গে থাকুন।
মন্তব্য: স্পষ্টতার প্রয়োজনে কিছু উদ্ধৃতি সম্পাদনা করা হয়েছে।
ব্যক্তি-তথ্য
অরবিন্দ শর্মা সক্ষম ও অ্যাসিস্টেক ল্যাব, আইআইটি দিল্লি—এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি প্রচেষ্টার মুখ্য প্রশিক্ষক, এতে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের— সহায়ক প্রযুক্তির সাহায্যে পড়া, লেখা ও ডিজিটাল সাক্ষরতার পাঠ দেওয়া হয়।
ক্লাউডিয়া পোজো একজন গবেষক এবং হু’জ নলেজ?—এ অনলাইনে জ্ঞান ও জ্ঞান সম্পর্কিত ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে কাজের একজন সমন্বয়কারী।
ঈশান চক্রবর্তী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং ভাষা ও অ্যাকসেসযোগ্যতা কর্মী
খানসা মারিয়া অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রোডস স্কলার, একজন প্রতিবন্ধকতা বিশেষজ্ঞ এবং অন্তর্ভুক্তি ও অ্যাকসেসযোগ্যতা কর্মী।
মারি মৈত্রেয়ী একজন গবেষক এবং হু’জ নলেজ?—এ অনলাইনে জ্ঞান ও জ্ঞান সম্পর্কিত ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে কাজের একজন সমন্বয়কারী।
পুথিয়া পুরাইল স্নেহা হায়দ্রাবাদস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি-এর অন্তর্গত ওপেন নলেজ ইনিশিয়েটিভস, রাজা রেড্ডি সেন্টার ফর টেকনোলজি অ্যান্ড সোসাইটির ঊর্ধ্বতন গবেষণা-পরিচালক।
পুথিয়া পুরাইল স্নেহা হায়দ্রাবাদস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ইনফরমেশন টেকনোলজি-এর অন্তর্গত রাজ রেড্ডি সেন্টার ফর টেকনোলজি অ্যান্ড সোসাইটির ঊর্ধ্বতন গবেষণা-পরিচালক।
রাহুল বাজাজ মিশন অ্যাকসেসিবিলিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা
শুভাশিস পাণিগ্রাহী অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগ, ডিজিটাল অধিকার, গোষ্ঠী-নির্মাণ ও ভাষা-প্রযুক্তির ক্ষেত্রগুলিতেও পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
শ্রীনিধি রাঘবন একজন প্রতিবন্ধকতাযুক্ত নারীবাদী, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও লেখক। লিঙ্গ, যৌনতা, প্রতিবন্ধকতা ও প্রযুক্তির প্রতিচ্ছেদন নিয়ে তিনি কাজ করছেন।
ভাস্কর ভট্টাচার্য্যি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) দ্বারা প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের উন্নয়ন, ই- অ্যাকসেসযোগ্যতা এবং তথ্যের অ্যাকসেসযোগ্যতা নিয়ে কাজ করছেন।
